যুগে যুগে বাঙালির ইতিহাসে এমন সব মনীষীদের আগমন ঘটেছে যাঁরা সমাজ ও মানুষের
কল্যাণে নিঃস্বার্থভাবে তাদের কথা ও কাজের মধ্য দিয়ে উজ্জীবিত করেছেন। বিশেষ
করে সংস্কারকের ভূমিকায় দায়িত্বশীল নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন। মহিয়সী রোকেয়া এমনই
ব্যক্তিত্ব যিনি তার সময়ের চেয়ে একশ অথবা দুইশ বছর এগিয়ে ছিলেন। তার ছিল
আধুনিক, উদার ও
বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি। আর এসব কারণে বাংলার অসহায় নারী জাগরণে
মহিয়সী রোকেয়ার ক্ষুরধার লেখনীর যথেষ্ট অবদান রয়েছে বলে গবেষকরা অভিমত প্রকাশ
করেছেন।
একশ বছর পূর্বে তিনি তাঁর লেখায় নারীর অধিকার ও স্বাধীনতা প্রসঙ্গে যেসব কথা
বলেছেন তা বর্তমানে গভীরভাবে উপলব্ধি করা হচ্ছে শুধু নয়, নারী তার মেধা, দক্ষতা ও আত্মত্যাগের মধ্য
দিয়ে প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছে। আজ বিশ্বের সর্বত্র আমরা নারীর ক্ষমতায়ণের
কথা শুনছি, দাবিও
উঠছে।
নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার জন্য জাতিসঙ্ঘ সনদ প্রণীত হয়েছে, দেশে দেশে নারী উন্নয়নের
নীতিমালা রয়েছে। এসব কথা আমরা রোকেয়ার রচনার মধ্যে খুঁজে পাই। রোকেয়া তার জীবনব্যাপী সাধনা
দিয়ে নারীর অধিকারের প্রশ্নটি তুলেছেন সমাজের কাছে। আর পুরুষের চোখে আঙুল দিয়ে
দেখিয়ে দিয়েছেন তারা কীভাবে নারীকে বঞ্চিত, অবহেলিত ও শোষিত করে তাদের অধীনে বন্দি করে রেখেছে যেখানে স্বাধীনতা বলতে
কিছুই ছিল না। নারীর ওপর পুরুষ যেন প্রভূত্বের স্থান দখল করে রেখেছে। নারীকে মানুষ নয়, পুরুষ তার অধীনস্থ ক্রীতদাসী
হিসেবে বিবেচনা করতো। নারীর জীবন ছিল পশুরও অধম। পুরুষের মধ্যেও সেকালে তিনি এক নব জাগরণ
ঘটিয়েছেন। আমাদের স্বীকার করতে হবে পুরুষ জেগেছিল বলেই তাদের কন্যারা পরবর্তীকালে
শিক্ষার সুযোগ পায়–রোকেয়ার
সার্থকতা এখানেই।
রোকেয়ার পূর্বে নারীর অবস্থা কেমন ছিল আমরা ইতিহাসের পাতা খুললেই তার যথেষ্ট
প্রমাণ পাই। আমরা দেখতে পাই কন্যা সন্তানের জন্ম হলে কেউ সন্তুষ্ট হতো না। পুত্র
সন্তানের জন্ম সৌভাগ্য মনে করা হতো। কন্যার অভিভাবক শৈশবে পিতা, তারপর বিয়ে হলে স্বামী এবং
বার্ধক্যে পুত্র হয়েছে। নারী নিজে অভিভাবক ছিল না সন্তানদের। কন্যাকে
শিক্ষা দেয়া হতো শুধুমাত্র ধর্ম, সেলাই, রান্না, ইত্যাদি গার্হস্থ কর্মকাণ্ড। এ
শিক্ষায় যে যত পারদর্শী হতো তারই প্রশংসা হতো। নারীর জীবন ছিল স্বামীর
মনোরঞ্জন, তার
সেবাযত্ন, সন্তান
গর্ভে ধারণ, জন্মদান
ও লালন পালন। সংসারে তার কোনো মতামত ছিল না, অধিকারও ছিল না। ফলে পরিবারেও তার কোনো সম্মান ছিল না।

No comments:
Post a Comment